19/10/2022
টুকটুকি – তোমাকে নিয়ে কিছু কথা যা ভোলার মত নয়
টুকটুকি – তোমাকে নিয়ে কিছু কথা যা ভোলার মত নয়: দু’জন মানুষের আত্তা দু’ই পাড়ে থেকেও যেন এক। নুহাস তার পরকালে থাকা প্রেমিকাকে নিয়ে যেন নতুন এক জগত গড়ে তুলেছে। দিব্যি সংসার করে চলছে। টুকটুকিতেই বেঁচে আছে নুহাস।
পর্ব ১
বিছানায় নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা পিচ্চি মেয়েটার হাত ধরে বসে আছে নুহাস। নুহাসের ভেতরের ছটফটানি বাড়ছে ধীরে ধীরে। শ্বাসগুলো আছড়ে পড়ছে টুকটুকির হাতের উপর। টুকটুকির হাতটা ধরে বুকে বাম দিকে ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে নুহাস,
~শুনতে পাচ্ছিস টুকটুকি! শুনতে পাচ্ছিস আমার ভেতরের উথাল-পাতাল হওয়ার শব্দ? তোর নুহাসের যন্ত্রণা,ছটফটানি? প্রেম মিশ্রিত চিৎকার। পাচ্ছিস শুনতে?
তোর প্রতি টান। পরছিস অনুভব করতে? সহস্র বর্ষ যে তোকে ভালোবাসা বাকি আছে এখনো।
বাচ্চাদের মতো কাঁদছে নুহাস। নাক টানছে অনবরত। ফোঁপাচ্ছে। হাতের ওল্টো পিঠ দিয়ে ঘষে চোখের জল মুছে নুহাস আবার বললো,
~এই ওঠ না। টুকটুকি? দেখ আমি তোকে আর বকব না। তোর নিত্যদিনের সব আবদার পূরণ করব। রোজ শিউলী ফুল দেব আমার গাছ থেকে। যত খুশি নিস ফুল। গিটার বাজাব তোর জন্য। বৃষ্টিতে ভিজলেও বকবো না আর। ওঠবি তুই? ফাজলামো হচ্ছে? আমার কষ্ট দেখিস না?
নুহাস আবার ভেসে গেল চোখের জলে। টুকটুকি কে ডাকতে ডাকতে যে তার প্রত্যেক রাত পার হয়। পার হয় দিন। পার হয় বছর।
কিন্তু এই পিচ্চি মেয়েটার যে এত তেজ,এত ঝাল আছে এই মেয়ের প্রেমে কে জানতো।
আকাশচুম্বী অভিমাণ পিচ্চিটার মনে। নুহাসের প্রতি। ওর ডাক্তার বাবুর প্রতি। আচ্ছা রাগ আছে,অভিমাণ আছে ঠিক। তবে ভালোবাসাও তো আছে। আছে সহস্র বর্ষের জমানো প্রেম। অল্প নয়! আছে এক সমুদ্র সমান প্রেম। আঠারো বছরের পিচ্চি মেয়েটা যে তার বয়সের চেয়ে অধিক ভালোবাসে নুহাসকে। তাহলে ভালোবাসার চেয়ে অভিমাণের ভার বেশি হবে কেনো?
কেন প্রতিটা দিন চোখ বুজে থাকবে? নুহাসের চোখে চোখ রেগে অবোধ আবদার করবে না। নুহাসের যে ব্যাথা হয়। দলা পাঁকানো ব্যাথারা গলায় আটকে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সর্বাঙ্গে ছড়ায়।
অন্যসব দিনের মতো আজ রাতেও টুকটুকির হাত বুকে ঠেঁকিয়ে ঘুমের অতলে ডুব দিল নুহাস।
অতীত…
হাতের মুঠো ভর্তি করে স্বচ্ছ সাদা আর কমলা রঙ্গের গভীর মিশ্রনের শিউলী ফুল নিয়ে এলো নুহাস। টেবিলে খুলে রাখা সাদা খাতার উপর রেখে দিল।
নুহাসেথ ঘর্মাক্ত মুখটা চকচক করছে। কপালে ল্যাপ্টে আছে সোজা সোজা চুলগুলো। ফুলগুলো রেখে মুচকি হাসলো। বিরবির করে বললো,
~এত শিউলী ফুল একসঙ্গে পেলে তো পাগলই হয়ে যাবে আমার টুকটুকিটা। ধুপ করে মাথা রাখবে আমার বুকে। তারপর নিজেই লজ্জা পাবে। হাহা।
কালো শার্টটা সাদা শরীরের সাথে আষ্টেপিষ্টে লেগে আছে। টুকটুকি এখন কাছে থাকলেই জড়িয়ে ধরে মুখ ডুবিয়ে দিত বুকে। নুহাস মুচকি হাসলো। টি-শার্ট আর টাওজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
মাবিয়াত জামান নুহাস। ইবনে নজরুল জামান আর জোবেদা মাহমুদের বড় ছেলে। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে ইন্টার্নশীপ করছে। দেখতেই সেই রকম সুন্দর। বয়স পঁচিশ। ৫’৮ লম্বা,সুঠাম দেহ,সোজা সিল্কি চুল,মায়াবী চেহারা,যে কোনো মেয়ের নজর কাড়ার অধিকার রাখে। নুহাসের ছোট ভাই নিবির জামান। নুহাসের থেকে একবছর ছোট হলেও পড়ালেখা একসাথেই। সেও নুহাসের সাথেই ঢাকা মেডিক্যালে পড়ে।
মেজো চাচার দুই মেয়ে মাহিলা আর মিশ্মি,ছেলে নাভিন আর চাচি সেলিনা খাতুনকে নিয়ে যৌথ পরিবার নুহাসদের। টুকিটুকির মা অর্থাৎ রেহানা মনোরমার ছোট মেয়ে।
নুহাস বাড়ি এসছে টের পেয়েই ছাদ থেকে দু’বার হুমড়ি খেয়ে পড়ে দৌড়ে এলো টুকটুকি। মনোরমার সবচেয়ে ছোট নাতিনী। পুরো নাম ইপ্সাতুন মৌরিন। মা সৈয়দা রেহানা ইসলাম। বাবা আব্দুল ফাজর জামান আমেরিকা থাকেন। মা আর টুকটুকি তাই নানু বাড়িতেই থাকে। জামান বংশের সবচেয়ে ছোট মেয়ে মৌরিন। আদর করেই বড় করেছে ওকে।
নুহাস ভালোবেসে তাকে টুকটুকি ডাকে। নুহাসের চোখে টুকটুকি নিতান্তই পিচ্চি। ছয় বছরের ছো মেয়েটা ওর থেকে। তাও টুকটুকি ছোট থেকে খেলার সাথী নুহাস। শুধু খেলার নয় মনের সাথীও বটে। টুকটুকি মেয়েটা তার সবকিছুর আড়ালে ঘিরে রেখেছে নুহাসকে। নুহাসের চিন্তা ভাবনা অনুভূতি,সবকিছুই টুকটুকিকে ঘিরে।
নুহাসের ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল নুহাস নেই। টেবিলে চোখ পড়তেই চওড়া হলো ঠোঁটের ভাঁজ। স্পষ্ট হলো ঠোঁটের পাশের গর্ত। নুহাসের খাতার উপর অনেক অনেক শিউলী ফুল রাখা। খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেল টুকটুকি। অস্ফূটস্বরে মুখ থেকে বের হয়ে এলো,
~আআ,আর,আআআ।
হয়ত খুশিতে নুহাসকে বলতে চায় এত ভালোবাসো? এত এত ফুল এনেছো আমার জন্য?
কিন্তু গলায় এসে আটকে যায় কথাগুলো। আর বের করতে পারে না। প্রচুর কষ্ট হয়।
মনের চার দেয়ালে তৈরি সব বাক্য,সব শব্দ,সব ধ্বনি মিলে মিশে একই উচ্চারণ বের হয়ে আসে,
আআআ,আআআ,আআআ।
কথা বলতে পারে না টুকটুকি। তবে শুনতে পায় সব। বুঝতে পারে সব। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ পারে। নুহাস নিজে টুকটুকি সহ বাড়ির সকলকে শিখিয়েছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ।
নুহাস গোসল সেরে খালি গায়ে বের হয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। তোয়াল দিয়ে চুল মুছে নিচ্ছিল। বের হতেই চোখ পড়লো বিছানায়। নুহাসের গিটার জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে টুকটুকি। গিটারের চারিদিকে অসংখ্য শিউলী ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাদা চাদরটা রঙ্গিন হয়ে ওঠেছে।
নুহাস গভীর চোখে দেখলো টুকটুকিকে। মেয়েটা কথা বলতে না পারলেও তার চোখ,ঠোঁট দিয়ে খুব সহজেই ব্যাক্ত করে মনের স্বাদ। কিন্তু কানে শোনে ঠিকি। নুহাস তোয়ালটা সোফার উপর রেখে এগিয়ে গের খাটের দিকে। এক হাতে ভর রেখে টুকটুকির উপর ঝুকে বসলো নুহাস।
সাদা-মাটা একটা শাড়ি পড়ে আছে মেয়েটা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে দাদু পড়িয়ে দিয়েছে। মনোরমার শাড়ি। পুরো পুরোন বাংলা নায়িকাদের মতো লাগছে মেয়েটাকে। টুকটুকির চুলগুলো কোঁকড়া। হালকা খয়েড়ি বর্ণ। ছাড়া অগোছালো চুলের একগুচ্ছ অবিন্যস্তভাবে পড়ে আছে চোখের সামনে। নুহাস ডান হাত দিতের দুই আঙ্গুল দিয়ে চুলগুলো আলত করে কানের পেছনে গুজে চুম খেল কপালে। টুকটুকি হালকা নেড়েচেড়ে ওঠে পিটপিট করে চোখ মেললো। ঠোঁটের পাশে ভাঁজ সূক্ষ।
টুকটুকির হাসি-মাখা মুখ দেখলে নুহাসের বুকে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। শান্ত হয় চাহনী। উথাল-পাতাল শুরু হয় মনে।
নুহাস দ্রুত সোজা হয়ে বসে। টুকটুকি শুয়েই চেয়ে থাকে নুহাসের দিকে। নুহাস দ্রুত ওঠে টেবিল থেকে সিগেরেট হাতে নিয়ে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে তাকায় টুকটুকির দিকে। টুকটুকি ততক্ষণে ওঠে বসে। পিট পিট করে অবুঝের মতো তাকায় নুহাসের দিকে। নুহাস বারান্দায় যেতে যেতে গম্ভীর ভাবে বলে,
~আমার সামনে আর শাড়ি পড়ে আসবি না। মাথা ঠিক থাকেনা আমার।
টুকটুকি দ্রুত বালিশ চেঁপে ধরে তাকাল নুহাসের দিকে। আবার চোখ নামাল। লজ্জা নাক,কান লাল হয়ে গেছে। নুহাস অবাক হয়ে দেখছে। টুকটুকির মতো এত লজ্জাবতী মনে হয় ওর জীবনে দেখেনি। সামান্য সামান্য কথাতেও লজ্জা পায় মেয়েটা। লজ্জা যেন তার রক্তের সাথে বহমান। প্রসন্ন হাসে নুহাস। কন্ঠে মোহ ঢেলে বলে,
~তুই এত প্রেমময় কেনো টুকটুকি? কি আছে তোর মাঝে?
উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বারান্দায় চলে আসে নুহাস। পিছু পিছু টুকটুকিও আসে। নুহাসের সামনে এসে ওল্টে দাড়ায়। নুহাসের হাত দিকে সিগেরেটটা কেড়ে নিয় এক ঢিলে ফেলে দেয় বাহিরে। তারপর রাগ মিশ্রিত চোখে চেয়ে থাকে কতক্ষণ।
ধুপ করেই মাথা রাখে নুহাসের বুকে। দুই হাত দিয়ে পিঠ পেঁচিয়ে ধরে। নুহাস হাসে। বাহুবন্ধনে চেপে ধরে টুকটুকিকে।
~টুকটুকি!
বুক থেকে মাথা তুলে তাকায় নুহাসের দিকে। টুকটুকি ইশারায় বলে,
~কি?
~ফুচকা খেতে যাবি আমার সাথে? আজ নৌকায় ওঠাব।
টুকটুকির চোখ খুশিতে চকচক করে ওঠে। হাতের ইশারায় দ্রুত বলে,
~হ্যা। যাব যাব। তবে আমাকে চুড়ি কিনে দিতেই হবে।
নুহাস খোঁচা মারে,
~এহ! শখ দেখ মেয়ের। পাড়ব না কিনে দিতে। আর ফুচকা তো আমি খাব। তুই শুধু দেখবি।
শোনা মাত্রই মুখ ফুলিয়ে ফেলল টুকটুকি। এ মুখ ফুলিয়ে নিলে নুহাসের যা ভালোলাগে না! ! ! একদম পুতুলের মত লাগে মেয়েটাকে। নুহাস আবেগী কন্ঠে বললো,
~এই পুতুল। এত কিউট কেন তুই?
টুকটুকি ইশারায় বলে,
~তোমার মতো শয়তান না যে তাই।
নুহাস স্বজোরে হো হো শব্দ করে হেসে ওঠে। টুকটুকি চুপচাপ দাড়িয়ে নুহাসকে দেখতে লাগল। হাসলে নুহাসকে খুব সুন্দল লাগে। কপালে ভাঁজ পড়ে কিছু। চোখের পাঁপড়ি গুলো ঘন হওয়ার কারণে হাসিটা আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। টুকটুকির মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে নুহাসের সৌন্দর্যের বিবরণ নিজ মুখে দিতে। কিন্তু বলতে পারে না। তখন খুব কষ্ট হয়। চোখে পানি চলে আসে কষ্টে। মনে নামে আষাঢ়ের গাঢ় কালো মেঘের তুলারাশির মতো একগুচ্ছ বিষাদ।
নুহাস টুকটুকির সামনে তুড়ি মেরে বলে,
~কিরে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? প্রেমে পড়ে যাবি তো!
টুকটুকি মুখ বাকায়। ভেঙচি কেটে মাথা নাড়ায়। ইশারায় বুঝায়,
~মোটেই না। তোমার মতো একটা ছাগলের প্রেমে পড়বো। তাও আবার আমি!
হাসিতে লুতপুত খায় টুকটুকি। নুহাসও হেসে বলে,
~ফুপিকে বলবি তোকে যেন গাঢ় নীল শাড়ি পড়িয়ে দেয়। আর হে চুল ছাড়বি।
টুকটুকি খুশি মনে চলে যায়। বিকেলে দু’জন এক সাথে অনেক ঘুরাঘুরি করে। নেমে আসে সন্ধ্যে। টুকটুকিকে দাড়াতে বলে কোথাও একটা যেন যায় নুহাস।
টুকটুকি নুহাসের বাইক থেকে কিছুটা দূরে এসে দাড়ায়। বাতাসে চুলগুলো উড়তে থাকে। কিছুক্ষণ বাদেই নুহাস এসে টুকটুকির দু’হাত ভর্তি কালো চুড়ি পড়িয়ে দেয়। টুকটুকি খুশিতে ডগমগ হয়ে যায়।
নুহাস আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
~এখন একদম ঠিকঠাক আছে। নীল শাড়ি,কালো চুড়ি,হালকা লিপস্টিক,কাজলহীন চোখ,কোমর অবদি ছাড়া চুল। ওফ টুকটুকি! আমাকে কি পাগল করে ছাড়বি তুই?
টুকটুকি লজ্জায় মুখ লুকায় নুহাসের বুকে। কি লজ্জার মুখেই না ছেলেটা ফেলে দেয় ওকে বারবার। নুহাস বললো,
~আচ্ছা কাল তো তোর আবার কলেজ আছে। তাড়াতাড়ি বাসায় চল। নাহলে ফুপি আবার বকবে।
টুকটুকি এই কথা শুনেই জড়িয়ে ধরে নুহাসকে। তারপর নাছোড়বান্দার মতো হাত-পা ছুঁড়াছুড়ি করে ইশারা করে,যাবে না বাড়ি।
~না না,মা বকবে না। আমি এখনি যাব না প্লিজ।
~ভালোলাগে খুব। আমার ডাক্তারবাবুর সাথে থাকতে।
~ডাক্তার এখনো হইনি!
টুকটুকি হাতের ইশারায় বলে,
~তো?
~কিছুনা।
টুকটুকি হেসে মাথা নাড়ায়। নুহাস দুই হাত দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে ধরে টুকটুকির। তারপর বলে,
~আর আমার সামনে শাড়ি পড়ে থাকলে আমার যে তোকে আদর করতে ইচ্ছা করে। তখন?
টুকটুকি লজ্জা পায়। দু’হাত মুখে চেপে ধরে। নুহাস টুকটুকির মুখ থেকে হাত সরিয়ে আরো কাছে টেনে নেয় ওকে। টুকটুকি ইশারায় বলে,
~তাহলে বিয়ে করে নাও।
নুহাস টুকটুকির মাথায় টোকা দিয়ে হাসে। মুগ্ধভাবে বলে,
~ওরে বাবাহ! এইটুকুন পিচ্চি মেয়েটার কি শখ!
মাত্র বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলো আর্দ্র। আমেরিকার প্রভাবশালী বিজনেসম্যান আর্দ্র। বাংলাদেশে জন্ম হলেও বেড়ে ওঠা আমেরিকাতেই। খুব ছোট বয়সে বাবা-মাকে হারাতে হয়েছে শুধুমাত্র ধনী বলে। নিজের চাচা তার বাবা-মাকে খুন করে আর্দ্রকে বের করে দিয়েছিল বাড়ি থেকে। আর্দ্রর বয়স তখন নয় ছুঁই ছুঁই।
সেদিন মাসি আনা আর্দ্রকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল আমেরিকা। তার ছয় বছর বাদে সেও ছেড়ে গেছে আর্দ্রকে। বাস্তব আর মানুষের হিংস্রতার সাথে লড়াই করে গড়ে ওঠেছে এই বিশাল শিল্পপতি আর্দ্র।
বাংলাদেশে আশা শুধুমাত্র ওর পুতুলের জন্য। ওর ছোট্ট পুতুলটাকে যে ও ফেলে গেছিল একা। স্বার্থপরের মতো ছেড়ে গেছিল তাকে। ওর খালাতো বোন। আনার দু’ই মেয়ে ছিল। ছোট মেয়ে আফরা বান্ধবিদের সাথে খেলায় মগ্ন ছিল। মা হয়েও আনা সেদিন আর্দ্রর জীবন বাঁচাতে আফরা ফেলে বড় মেয়ে আকিকাকে নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
ফার্ম হাউজের সামনে এসে থেমেছে আর্দ্রর গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলে এক পা বের করে ভাবছে আর্দ্র। আর্দ্রর বয়স পঁচিশ। প্রায় ষোল বছর আগে ওর পুতুলকে বাংলাদেশে একা ফেলে চলে গেছিল আর্দ্র। সেই ভয়ানক দিনটা ষোলটা বছর আর্দ্রর হৃৎপিন্ডটা খুঁড়ে খুঁড়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে তার ঔষুন শুধু ওই বাচ্চা মেয়েটা। আচ্ছা ওর সেই ছোট্ট পুতুল আজ অনেক বড় হয়েছে না! উম আঠারো বছর বয়সী যুবতী। ভাবতেই ম্লান হাসির রেখা ফুটে ওঠে আর্দ্রর ঠোঁটে।
আকিকার ইচ্ছে করছে সব ভেঙ্গে চুড়ে ফেলতে। এতটা কেয়ারলেস কেন আর্দ্র নিজের প্রতি?
ও তো জানে বাংলাদেশে ওর কত শত্রু আছে। তাও আকিকার কথা না শুনে ওকে না বলেই চলে গেল বাংলাদেশ! ও মানছে ওদের কলিজার টুকরা পুতুল আছে সেখানে। তবে এরকম পাগলামীর মানে হয়? পুতুলকে কোথায় খুঁজে পাবে আর্দ্র? পুতুল বেঁচে আছে নাকি তাও তো জানা নেই ওদের। আকিকা ঘরের কিছু জিনিস ভেঙ্গে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো,
~ক্রুশেভ! ক্রুশেভ! হোয়ের আর ইউ? কাম হেয়ার রাইট নাও।
ক্রুশেভ আকিকার চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো। ক্রশেভ আকিকার বডিগার্ড। আঠাশ বছরের তরুণ ক্রশেভ। তবে যে কেউ দেখলে হয়ত বলবে সতের বছরের বালক। ক্রশেভ এসে ভয়ংকর চোখে দেখল রুমটাকে। সব কিছু ভাঙ্গচুর করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তার মাঝে বসে আছে আকিকা। ক্রশেভ ভয় মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
~ম্যাম। ম্যাম হোয়াট হ্যাপেনিং। হোয়াট আর ইউ ডুয়িং?
~অ্যাঅ্যা,জাস্ট শাট আপ।
চিৎকার করে ওঠলো আকিকা। রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
~আমি বাংলাদেশ যাব। এক্ষুণি সব এরেঞ্জ করো। না হলে প্রাইভেট এয়ারক্রাফ্ট হায়ার কর। বাট কুয়িক।
~বাট ম্যাম,ইটস ইম্পসিবল। স্যার মানা করে গেছেন
আপনাকে নিয়ে যেতে।
~আই থিংক তুমি ফায়ার হতে চাও না। যদি না চাও আমি তোমাকে জাস্ট থার্টি মিনিসট টাইম দিলাম।
ক্রুশেভ উপায়ান্ত না দেখে কঠিন সুরে বললে,
~ওকে একিকা (আকিকা)।
পর্ব ২
ছোট থেকেই নাচতে খুবি ভালোবাসে টুকটুকি। সবার মতে টুকটুকির রক্তে রক্তে নৃত্য মিশে আছে। গান ছাড়াও অসম্ভব সুন্দর নাচে টুকটুকি। রেহানাও ছোট থেকে নাম শিখিয়েছেন ওকে। আগামী সপ্তাহে টুকটুকির কলেজে একটি ইন্টার্নাল ডান্স কম্পিটিশনের জন্য নাচের প্র্যাক্টিস করছে ছাদে। পাশেই মনোরমা নিজের জলপাই,আম,চালতা আর তেঁতুলের ঝাল ঝাল আচার রোদে দিতে ব্যাস্ত। নিবির আর টুকটুকির মধ্যে সবসময়ই ঝগড়া হয় তেঁতুলের আচার নিয়ে। টুকটুকি ছোট বলে সবসময় এটা ওটা বলে নিবিরকে ফাঁসিয়ে আচার নিয়ে পালিয়ে যায়।
টুকটুকি ছাদের দক্ষিণ পাশে মোবাইলে গান ছেড়ে নাচছে। আর তার ঠিক দশ হাত দূরে নিবির দাড়িয়ে। ছাদের রেলিংএ পিঠ আর হাতের পেঁছন ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে রুহির সাথে দিব্যি চ্যাটিং করছে।
দিন পড়ে এসছে। আকাশ আস্তে আস্তে রক্তিম আভা ধারণ করছে। এক মুঠো রোদ সাদা মেঘের আড়াল থেকে সব বিচ্ছেদ্য পথ পাড়ি দিয়ে এসে পড়ছে টুকটুকির গায়ে,মুখে,চোখে। নিবির টুকটুকির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দুটো ছবি তুলে নিলো ঝটপট। তুলেই পাঠিয়ে দিল নুহাসের মেসেঞ্জারে।
দু’মিনিট পরই নুহাস রিপ্লাই দিল,
~ভাই রোগী দেখতাছিলাম।
নিবির একগাল হেসে বললো,
~দেখ ভালো কইরা দেখ। মানা করল কে?
~দিলি তো কাম সাইরা। এখন পিক দিতে কইছিল কে?
~ভালো না লাগলে ডিলিট কইরা দে।
~মাইর খাইতে চাস? ভিডিও কল দে।
~হা হা হা। দিমু না। টুকটুকি নাচতাছে।
~আমি কিন্তু রুহি ফোন কইরা কমু তুই ছোট থাকতে মারিয়ার লগে প্রেম করতি।
~ওহ হারামি। জীবনটা ত্যানা ত্যানা বানায় দিছস এই এক কথা লইয়্যা। দিতাছি কল। রিসিভ কর। বজ্জাত কোনখানকার।
নিবির ভিডিও কল দিতেই নুহাস দেখতে লাগলো ওর টুকটুকিকে। নাচার সময় টুকটুকির কোমর অবদি বেনুনী থেকে যখন চুল গুলো অর্ধেক বের হয়ে বারবার মুখে,চোখ আছড়ে পড়ে অপূর্ব লাগে টুকটুকিকে। মনে হয় কোনো এক নির্লিপ্ত মায়ায় আচ্ছন্ন তুলেছে নিজেকে।
ছুটে আশা এক পশলা রক্তিম রোদে টুকটুকির কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু পানিগুলো মুক্তার মতো লাগছে।
হঠাৎ মনোরমা আচারের বোয়াম গুলো তুলতে তুলতে বলেন,
~এইবার যদি আমার আচারের বোয়াম তোরা কেউ চুরি করছ,দেখিস পিডাইয়্যা মাইরা ফালামু।
মনোরমার কথায় টুকটুকি ভেঙচি কাটলো। নিবির বললো,
~কালকের মধ্যেই চুরি করে খেয়ে ফেলব সব। দেখো খালি।
~হতোচ্ছারা। তুই যদি আচার ধরোছ ও না অনেক পিটুনি খাবি।
~এহ দিনে দিনে তো বুড়ি হইছো। আচাড় দিয়া করবটা কি?
~কি? আমি বুড়ি হইছি? দাড়া তুই।
নুহাস দেখছে আর হাসছে। মনোরমা নিজের লাঠি দিয়ে তাড়া করছে নিবিড়কে। টুকটুকি খিলখিলিয়ে হাসছে। যেন এর চেয়ে মজাদার কান্ড সে দেখেনি আর কখনো।
হাসতে হাসতে হঠাৎই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে টুকটুকি। নুহাস আৎকে ওঠে। কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। নিবির দৌড়ে আসে টুকটুকির কাছে। মনোরমাও আসেন। ভরকে গেছেন তিনি ঘটনার আকস্মিকতায়। নুহাস অসহায়ের মতো দেখে ওর টুকটুকিকে।
নাইট ডিউটি থাকা স্বত্তেও বাইক নিয়ে বের হয়ে যায় হসপিটাল থেকে। বুকের ভেতরটা ধুক ধুক করছে। মনে হচ্ছে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসছে। আধঘন্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যায় নুহাস। ততক্ষণে টুকটুকির জ্ঞান ফিরেছে।
বাড়িতে এসে কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দেয় জোবেদা। নুহাস কিছু না বলে দৌড়ে চলে আসে টুকটুকির ঘরে। হঠাৎ পড়ে যাওয়া মাথার বাম পালে একটু চোঁট পেয়েছে। ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে নিবির। টুকটুকি আধাশোয়া ভাবে বসে ছিল। পাশে মনোরমা আর রেহানা। নজরুল চিন্তিত ভাবে ঘরের মাঝে পাইচালি করছিলেন। ছেলেকে আসতে দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন। নুহাসের আশেপাশের কিছুই খেয়াল নেই। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো টুকটুকিকে। চোখের কার্ণিশে জমা পানি ফিটকে বের হয়ে এলো।
নুহাস টুকটুকির মাথা শক্ত করে চেঁপে আছে নিজের বুকে। মেয়েটার সামান্য কিছু হলেই মাথা ঠিক থাকে না ওর।
কিছুক্ষণ বাদে নুহাসের মন শান্ত হলে বন্ধন হালকা হয়। টুকটুকি লজ্জায় খোঁচা দেয় নুহাসের পেটে। অদ্ভুত রকম চমকে ভ্রঁ কুঁচকে তাকায় নুহাস। ভ্রঁ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করেকি?
টুকটুকি মাথা নাড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলায়। নুহাসের খেয়াল আসে বাসার সব বড়রা এখানে। লজ্জা পেয়ে কিছুটা সরে আসে নুহাস। নিবির আগেই বের হয়ে যায় ঘর থেকে।
নজরুল হাসে নিজের ছেলের কান্ডে। দিনে দিনে বড় নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে তার ছেলে প্রেমে পড়ে। নজরুল হেসে বলেন,
~বাবা তুই না ডাক্তার! দেখ,ভালো কইরা দেখ টুকটুকির মা’র কি হইছে। আমরা বরং যাই।
একে একে সবাই বের হয়ে যায় ঘর থেকে। নুহাস আবার হাত টেনে টুকটুকিকে নিজের বুকে এনে ফেলে। নরম গলায় বলে,
~এই বুকে তো আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলি একটু আগে। দেখছিস কেমন কাঁপছে এখনো?
টুকটুকি মাথা ওঠায়। ঠোঁটের ইশারায় বলে,
~বারে! আমি কি করলাম?
~খুব দুষ্টু হয়েছিস না? আচ্ছা এভাবে মাথা ঘোরালো কেনো তোর? দুপুরে তো আমি এসে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম। ক্ষুধা পেয়েছিল?
টুকটুকি আ,আ,আ,শব্দ করে মাথা দুই পাশে নাড়ায়। নুহাসের বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকে। নুহাস আবার চিন্তিত কন্ঠে বলে,
~এখন খারাপ লাগছে?
টুকটুকি দ্রুত ডানে-বামে মাথা নেড়ে নুহাসের বুকে মুখ লুকিয়ে নাক ঘঁষে।
৫
মোবাইলের স্কিনে পুতুলের কিছু ছবি দেখে কথা বলছিল আর্দ্র। অভিমাণ,রাগ,ভালোবাসা অনুভূতির মিশ্রণে কন্ঠটা অদ্ভুত শোনাচ্ছিল। আর্দ্র পুতুলের ছবি দেখে ফিসফিসিয়ে বললো,
~এত দিন অনেক রাগ করে থেকে ছিস। আমি কিচ্ছুটি বলিনি। চুপচাপ তোর রাগ,অভিমাণ মেনে নিয়ে আমার প্রতি। আর না। এবার তোকে ধরা দিতেই হবে আমার কাছে। আমার পুতুলকে আমি খুঁজে নেবই এবার।
গভীর রাতেও উভ্রান্তের মতো গাড়ির দড়জা খুলে পা ছড়িয়ে বসে আছে আর্দ্র। শার্টের উপরের চারটে বোতাম খোলা থাকায় উন্মুক হয়ে আছে আর্দ্র সাদা বুক। মাথার গাঢ় খয়েরি কেশগুচ্ছ অবিন্যস্তভাবে পড়ে আছে কপালের উপর। গাঢ় লাল ঠোঁট। নীল চোখ দুটিতে উপছে পড়ছে জল।
চোখের জলের ওজন হয়না। নাহলে আর্দ্র ওর পুতুলকে বলতে পারত দেখ সবার চেনা-পরিচিত স্ট্রং ডেশিং আর্দ্র আহমেদ লুকিয়ে লুকিয়ে কত চোখের জল ফেলেছে তোর জন্য!
গাড়ি থেকে ডুলতে ডুলতে নামে আর্দ্র। পুতুলের নাম জপে পড়ে যেতে নিলেই দুটো শক্ত হাত আটকায় ওকে। মাথা ঘুরে পেছন দিকে তাকাতেই বলে,
~এই এই এই তুমি কে বলতো? কোথায় যেন দেখেছি!
~কোথাও দেখনি ড্যাম ম্যান। তুমি আমার সাথেই বড় হয়েছ।
কপট রাগ দেখিয়ে বলে ক্রশেভ। আর্দ্র মাতাল ছির। পুতুলের কথা ভাবলেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না ও। ক্রুশেভ রেগে বললো,
~আজ কি কি খেয়েছ শুনি?
~মদ,আফিং,সিগেরেট!
~নিজেকে অন্তত এতটুকু ঠিক রাখো যাতে নিজের ডলের সামনে গিয়ে দাড়াতে পারো। ভেতরটা তো পঁচিয়ে ফেলছ সব।
কন্ঠ দৃঢ় হয় ক্রুশেভের। আকিকার বডিগার্ড হলেও সম্পর্কটা অনেক গভীর থেকে ওদের সাথে ক্রুশেভের। ক্রুশেভ ছোট থেকেই বড় হয়েছে ওদের সাথে। কঠিন আর্দ্রও যখন রাতের আঁধারে ভেঙ্গে পড়ে ক্রুশেভ সামলেছে তাকে। বন্ধুর মতো!
না নিজের ভাইয়ের মতো। দুই ভাই বোনের সামনে ঢাল হয়ে থেকেছে ক্রুশেভ।
৬
নুহাশের বুকে মাথা ঠেঁকিয়ে কখন ঘুমের অতলে হারিয়েছে জানেনা টুকটুকি। সকালের এক গুচ্ছ রোদ জানালার কাঁচে এসে পড়ে। মৃদু হয়ে স্নান করায় টুকটুকিকে রৌদ্যজলে। টুকটুকির ডান হাত আপনা আপনি চলে আসে চোখের উপর। মাথা উচুঁ করে নিজের অবস্থান দেখে নেয় সে।
নুহাস ঘুমছে। ওর মাথায় চিবুক ঠেঁসে ঘুমচ্ছে। ওঠার জন্য নরতেই একটানে টুকটুকিকে খাটে ফেলে তার উপর ঝুঁকে শোয় নুহাস।
টুকটুকি চোখ বুঝে আছে দেখে নুহাস মুচকি হাসে। একচোখ ফাঁক করে একটু দেখে নুহাসকে। দেখেই রেগে বলে,
~আআ,আআআআ।
নুহাস বুঝে ওঠে টুকটুকি ভয় পেয়েছে। হেসে ওর নাকে নাক ঘঁষে দেয়। আহ্লাদি কন্ঠে বলে,
~আচ্ছা ভালোবাসার বৃষ্টি আছে?
টুকটুকি না বোঝার ভান করে ঠোঁট উল্টায়। নুহাস হেঁসে বলে,
~আমি ভালোবাসার অঝর ধারায় বৃষ্টি হয়ে নামতে চাই তোর উপর। ভিজিয়ে দিতে চাই তোর হৃদমাঝার। আমার প্রেমের বৃষ্টিতে খরায় উত্তপ্ত মাঠের মতো ভিজবি তুই। শুষে নিবি সব প্রেম,সব নেশা,সব মোহ।
আমি আমারো মাঝে বাঁধিব তোরে,আর তুই! অক্লান্ত প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াবি আমার মাঝে।
টুকটুকি ভীষণ লজ্জায় দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। নুহাস হেসে হাত সরিয়ে দেয়। দুই হাত দিয়ে টুকটুকির গাল চেপে ধলে কপালে চুমু দেয়।
নুহাস সোজা হয়ে ওঠে বসে। বালিশ নিয়ে হেডবোর্ডের সাথে রেখে আধাশোয়া হয়। হঠাৎই মুখে ঘন আষাঢ়ের কালো মেঘের ছায়া ছাপিয়ে বলে,
~একটা কথা ছিল।
টুকটুকি শোয়া থেকে ওঠে আসন করে বসে। জিজ্ঞেসা বোধক ভাবে তাকিয়ে বলে,
~আ আ আআ।
নুহাস হাটু ভেঙ্গে বসে। টুকটুকির দিকে তাকায়। ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে চোখ সরিয়ে নেয়। উদাসী সুরে বলে,
~আমি কাল ঢাকা যাচ্ছি। সাত মাসের জন্য।
টুকটুকির মুখটা চুপসে গেল নিমিষে। হাত ঝাকিয়ে দেখালো,
~কেন? আমি যাব না?
~তোর কলেজ আছে। তাছাড়া আমি যাচ্ছি হসপিটালের জন্য। কোথায় থাকব এখনো জানি না।
টুকটুকি নিশ্চুপ। নুহাস টুকটুকির দুই হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে বললো,
~যদিও থাকতে পারিনা তোকে ছাড়া। তাও থাকতে হবে।
টুকটুকি হাত দিয়ে নিজেকে দেখিয়ে ইশারা করলো,
~আমি পারব না থাকতে। আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে। আমিও যাব।
নুহাস মুচকি হেসে মাথার চুল এলোমেলো করে দিল টুকটুকির। আরো কাছে টেনে কোমর পেঁচিয়ে ধরলো দুই হাতে। টুকটুকি এক হাতে নুহাসের শার্ট খাঁমচে অন্য হাতে গলা পেঁচিয়ে ধরলো। নুহাস দুষ্টমি কন্ঠে মিশিয়ে বললো,
~তোর বয়স এবার আঠারোতে পড়লো না? সাতমাস অপেক্ষা কর। এসেই বিয়ে করে নিজের করে নিব।
টুকটুকির ঠোঁট প্রসস্থ হয়। ঠোঁটের নিজের ভাঁজ আরো সুগভীর হয়। ফাজলামো করে নুহাসের চুল টেনে দেয়। নুহাস বলে,
~তুই লজ্জা পাস কেন? তাও আবার আমার সামনে?
~তো আর কার সামনে পাব?
~তুই জানিস যখন তোর চোখ,মুখ লজ্জায় নুইয়ে পড়ে বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে ওঠে। মাথা নিচু করে যখন ঠোঁট কামড়ে থাকিস মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র নারী তুই। প্রেমময়ী। সারাজীবন এমনটা থাকিস।
৭
মাহিলার বিয়ের কথাবার্তা চলছে রিয়াদের সাথে। ছেলেটা বেশ ভালো। নম্র-ভদ্র আর টাকা পয়সা ওয়ালা। ছেলে পক্ষের সমস্যা শুধু একটাই। তা হলো মিশ্মি। মিশ্মি মাহিলার থেকে বড়। দেখতে শুনতেও মাহিলা থেকে বেশি সুন্দরী,স্মার্ট। তাও কেন বিয়ে করলো না।
মিশ্মি বয়ফ্রেন্ডকে খুব ভালোবাসত সে। মাত্র চার মাস আগেই মিশ্মিকে ছেড়ে অন্য এক মেয়েকে সরাসরি বিয়েই করে নিলো।
মিশ্মি নিয়ামূল জামানকে বলে দিয়েছে বিয়ে সে করবে না। একটা কলেজে চাকরি করে। তা দিয়ে নিজের জীবন চালাতে আর বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে দেখতে কোন সমস্যা হবে না। নিয়ামূলেরও কোন ভাবান্তর নেই। মেয়েকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা তিনি দিয়েছেন।
কলেছে ক্লাস শেষ দাড়িয়ে আছে মিশ্মি আর টুকটুকি। আকাশ ঠেঁলে বৃষ্টি নামার উপক্রম। তবুও একটা রিকশাও পাচ্ছেনা।
হঠাৎ একটা গাড়ি আসতে বাধ্য হয়ে সামনে হাত মেলে লিফ্ট চাইলো মিশ্মি। কিন্তু গাড়িটা থামলো না।
দু’মিনিট বাদে আবার পাল্টা এলো গাড়িটা। টুকটুকি আর মিশ্মির সামনে এসে গাড়ির গ্লাস নামলো আর্দ্র। ততক্ষণে বড়বড় ফোঁটায় শুরু হয়েছে বৃষ্টি।
চোখ থেকে সানগ্লাস নামিয়ে টুকটুকির আপাতমস্তক দেখে নিল আর্দ্র। মেয়েটাকে সেদিন রাতে সে দেখেছে। নীল শাড়িতে।
হ্যা একেই দেখেছে। অপূর্ব লাগছিল।
আর্দ্রর চোখ সরানো দায় হয়ে পড়েছে। তাও দ্রুত সামলে নিলো আর্দ্র। বাম হাত চোখ সানগ্লাস পড়ে নিয়ে বললো,
ওঠে বসুন আপনারা।
পর্ব ৩
বৃষ্টির পানি টিনের চাল বেয়ে পানির বালতিতে পড়ে টুপ টুপ আওয়াজে মাতিয়ে তুলছে পরিবেশ। চিলেকোটার ঘরের ছাউনি টিনের চালের। বৃষ্টির সময় টিন আর পানির সংঘর্ষে যে ধপাধপ আওয়াজ হয়,শুনতে বেশ লাগ টুকটুকির। মনে গেঁথে যায়,হৃদয়ে বসে যায়।
বৃষ্টি হলেই ছুটে আসে এখানে। বৃষ্টি হলো মাত্র। ঝুম বৃষ্টি। ছাদের ঘরটার সামনের বালতি দুটো প্রায় ভরে এসছে। পানি পড়ছে তো পড়ছে। টুপ টুপ টুপ।
টুকটুকি দুই হাত কাঠের টেবিলটাতে রেখে গালে ঠেস দিয়ে বসে বসে দেখছে। সামনে মুঠোফোন রাখা। নুহাসের কল দেয়ার কথা ছিল। সেই একঘন্টা হলো বসে আছে টুকটুকি।
বেগুনি পাড়ের সাদা শাড়ি পড়েছে সে আজ। নুহাস শাড়ি ভালোবাসে। পড়েছে বললে ভুল হবে। মনোরমা পড়িয়ে দিয়েছে। চুল আঁচড়ে দিয়েছে। মাথার মাঝে সিঁথি। ঠোঁট দু’টো আইসক্রিম খেয়ে লাল লাল হয়ে আছে। কিন্তু নুহাসই তো ফোন দিতে লেট করছে।
ভাবতে ভাবতেই টুং করে বেজে ওঠো মোবাইল। খুশির চোটে হুমড়ি খেয়ে পড়লো টুকটুকি ফোনে। কল রিসিভ করতে নিয়ে চোখে পড়লো অপ্রত্যাশিত কারো নাম্বার।
ভ্রুঁ কুঁচকে নাকের পাটা ফুলালো টুকটুকি। বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে চলে এলো নিচে। খালি পা’য়ে পানির উপর নিসংকোচে তৈরী করলো এক অনুভূতির অভিব্যাক্তি।