06/08/2026
৫ আগস্ট: গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর—আত্মত্যাগের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
আজ ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
এই আন্দোলনে অসংখ্য ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়েছেন, হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন, অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি সমগ্র জাতির ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল এবং বেদনাবিধুর অধ্যায়।
গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করে এবং বর্তমানে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে আজও একটি প্রশ্ন জাতির সামনে স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে—যে আদর্শ, যে স্বপ্ন এবং যে প্রত্যাশা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমেছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?
যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, দখলদারিত্ব ও সহিংস রাজনীতি থেকে মুক্ত দেখতে চেয়েছিল তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
আজও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, মারামারি, দখলদারিত্ব ও অস্থিরতার খবর প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হচ্ছে।
শিক্ষাঙ্গনকে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, চরিত্র গঠন ও নেতৃত্ব বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবতায় তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।
আরও একটি বাস্তবতা উদ্বেগজনক। আন্দোলনের পর দেশের তরুণদের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের দিকে আরও বেশি মনোযোগী করে তোলার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে গ্রাস করে রেখেছে। ফলে যে পরিবর্তনের জন্য রক্ত ঝরেছিল, তার মৌলিক লক্ষ্যগুলো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
একটি গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটে, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার ও মর্যাদা নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারে।
আজ ৫ আগস্টে শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি আত্মসমালোচনাও জরুরি। তাঁদের আত্মত্যাগকে কেবল বার্ষিক স্মরণসভা বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়; বরং সেই আত্মত্যাগের চেতনাকে রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা মনে করে, একজন শিক্ষার্থীর প্রথম ও প্রধান পরিচয় একজন শিক্ষার্থী। শিক্ষাঙ্গন হবে জ্ঞান, আদর্শ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র; কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিহিংসা বা ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র নয়।
৫ আগস্টের আত্মত্যাগ কোনো রাজনৈতিক বিজয়ের দিন নয়; এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকারের দিন। সেই অঙ্গীকার—ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, বৈষম্যহীন সমাজ, দলীয় সহিংসতামুক্ত শিক্ষাঙ্গন, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।
আসুন, শহীদদের রক্তকে শুধু স্মরণ নয়, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্মান জানাই। আল্লাহ তাআলা সকল শহীদকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং প্রিয় মাতৃভূমিকে শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা