16/11/2024
কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি
কোটা আন্দোলনের মতো একটি অপ্রয়োজনীয় ইস্যু - যার সমাধান হয়ে গিয়েছিলো - তাকে টেনে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ছাত্র সমাজ। তাদের বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়ে কথা বলতে গেলে তারা এমনকি ইউনূসের এই ১০০ দিনের অপশাসন, জ'ঙ্গীশাসন দেখার পরেও এঁড়ে বাছুরের মতো তেঁড়ে আমাকেই মারতে আসবে। এমনই তাদের আইকিউ! যাহোক, সে কটাক্ষে না যাই। তারাই দেশের ভবিষ্যত। বেচারারা যে ভুল করেছে, তার শাস্তিও শুরু হয়ে গেছে। আজ হোক, কাল হোক, আরো শাস্তি লোডিং নিঃসন্দেহে। একসময় না একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তাদেরও মাথা খুলবে আশা করা যায়।
তবে আন্দোলনে সমর্থন দেয়া, ফেসবুক লাল করা, এমনকি রাস্তায় নেমে শ্লোগান দেয়াদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করা ছাত্ররা হলো যারা এখন পঙ্গু হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনের পরিবারকে রাজনৈতিক স্বার্থে সাহায্য দিয়ে ফটোসেশন করা হচ্ছে। বাকিদের পরিবার উপেক্ষিত। কিন্তু যারা মারা গেছে, তারা এক অর্থে বেঁচে গিয়েছে। যারা পঙ্গু হয়ে আছে, তাদেরকে সারাজীবনই এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে। বিপ্লবী পক্ষ যদি সততার সাথে চিন্তা করতো, তাহলে তাদের প্রথম প্রায়োরিটি হতো আহতদের যথাযোগ্য সুচিকিৎসা এবং তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ইন্টিগ্রেশনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
আমি মানুষ হিসেবে ভালো হই, আর খারাপ হই, হিপোক্রেট নই। আমি এখানে আলগা মানবতাবাদী সাজবো না। যারা জামায়াত ও ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনে ব্যবহৃত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, তাদের ওপর আমার কোনো বাড়তি মমত্ববোধ নেই। তারা বোকা। শাস্তি তাদের প্রাপ্য। যেহেতু মানুষ, সেহেতু একটু খারাপ লাগা আছে। এই পর্যন্তই। কিন্তু আমার এই লেখার উদ্দেশ্য তাদেরকে আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া তারা কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, কিভাবে এখন তাদেরকে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধিতার মুলা ঝুলিয়ে এখন তারা কিভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
৫ই আগস্টের পর সামনের সারির সমন্বয়কদের কপাল খুলে গেছে। কেউ উপদেষ্টা হয়ে তদবির বাণিজ্য করছে, কেউ গুচির ব্যাগ হাতে ইউরোট্রিপে যাচ্ছে। ইউনূস এক ধাক্কায়ই ৬৬৬ কোটি কর মওকুফ করে নিয়েছে। আপনি লিখে রাখতে পারেন, এই সমন্বয়ক ও ইউনূসরা যখন ক্ষমতা থেকে পালাবে, তখন কয়েক লক্ষ কোটি টাকাসহই বিদেশে পালাতে চেষ্টা করবে। কিন্তু যেখানে মাত্র কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করলেই আহতদের চিকিৎসা করা যেতো, সে টাকাটা ব্যয় করতে তারা উৎসাহী নয়। তাদের লোভ এমনই সর্বগ্রাসী। টাকা ব্যয় দূরে থাক, আহতদেরকে "ছাত্রলীগ" ট্যাগ দিয়ে দিচ্ছে, যাতে চিকিৎসা দূরে থাক, তাদেরকে এখন খুন করে ফেলাও জায়েজ হয়ে যায়। খুন হওয়ার পরে অবশ্য "শহীদের" তালিকায় একটি সংখ্যা বাড়বে। তখন সেটি নিয়ে রাজনীতিও করা যাবে। বেঁচে থাকলেই সমস্যা। বেঁচে থাকলেই টাকা চায়, চিকিৎসা চায়, অধিকার চায়।
উপদেষ্টা পদ না পাওয়া ২ চ্যাতা সমন্বয়ক সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ আহত আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে নিয়ে একটি পোস্ট ফেসবুকে দিয়েছে। পোস্টটির পরতে পরতে এদের প্রতি তাদের ঘৃণা উঁপচে পড়ছে। কিছু নমুনা দেখাই।
সারজিস লিখেছে, "আহতদের এক গ্রুপের দাবি হলো, ওদের এখন উপদেষ্টা বানাতে হবে।
আজ কালের মধ্যেই একটা গ্রুপ কাফনের কাপড় পড়ে রাস্তায় নামার প্রিপারেশান নিতেছে। "
সমন্বয়কদের মধ্যে ৩ জন উপদেষ্টা হয়েছে, তুই আর হাসনাতসহ কেউ কেউ একইরকম পাওয়ার দেখিয়ে মেরেমুরে খাচ্ছিস। তো এরা উপদেষ্টা হতে চাইলে তোদের সমস্যা কী রে ভাই! এরা কি লোয়ার ক্লাসের সমন্বয়ক, লোয়ার ক্লাসের আন্দোলনকারী, লোয়ার ক্লাসের ছাত্র? আর তোরা হায়ার ক্লাস? বৈষম্য হয়ে গেলো না ব্যাপারটা?
সে আরো লিখেছে, "মজার ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে অনেকেই ছাত্রলীগের লোকজন। ছাত্রদের হাতে মাইর খাইয়া আহত সেজে এখন আর হাসপাতাল ছাড়তেছে না।"
একজন ছাত্র যখন সারজিসদের ডাকে সাড়া দিয়ে পুলিশ পিটাতে গেলো, ছাত্রলীগ পিটাতে গেলো, তারপর মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো, তখন যদি তাকে শুনতে হয় যে, সে নিজেই ছাত্রলীগ, তাহলে তার অনুভূতি কেমন হবে? অতিশোকে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। তবে এখানে ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। সারজিসের কথা মতে, সারজিসরা ছাত্রলীগের পোলাপানকে পিটিয়েছে। ইউনূসের সাথে সাথে তার ইনডেমনিটি আইনও একদিন শেষ হবে। পুলিশ হত্যার বিচার হবে। ছাত্রলীগকে পেটানোর বিচারও হবে নিশ্চয়ই।
সারজিস লিখেছে, "আমার ধারণা পুরো রাজনীতির পেছনে দুইটা কারণ আছে।
১। এদের সাথে ছাত্রলীগের শক্ত যোগাযোগ আছে। এরা এসব করাইতেছে যাতে সাধারণ মানুষ মনে করে যে সরকার আহতদের চিকিৎসা করছে না। এতে পরেরবার কেউ যাতে রাস্তায় না নামে।
২। সরকার আহতদের টাকা আর কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখানে নেতা হতে পারলেই বড় অঙ্কের একটা টাকা মারা যাবে। এমনকি লিস্টে নাম ঢুকানোর বিনিময়েও টাকা খাইতে পারবে।"
তোদের সাথে আন্দোলন করলো, বেচারারা মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো। আর এখন তোদের সাথে আহতদের যোগাযোগ নাই; কিন্তু যোগাযোগ হয়ে গেলো ছাত্রলীগের সাথে! এটা কী শুনাইলিরে ভাই!
২ নম্বর পয়েন্ট হলো সার্জিসদের ছোটলোকির চূড়ান্ত উদাহরণ। আহতরা তো দৃশ্যমান। এমন না যে, আহত না হয়েই কেউ টাকার লোভে আহত সাজছে। প্রথমত চিকিৎসা এমন একটি বিষয়, যা যথাসম্ভব দ্রুতই করতে হয়। সার্জিসদের উচিত ছিলো ৫ই আগস্টে বা ৮ ই আগস্ট ইউনূস সরকারে বসার সাথে সাথেই প্রথম দাবি হিসেবে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। সুচিকিৎসার অভাবে অনেকেই ইতোমধ্যে পঙ্গু হয়ে গেছে। কিন্তু সারজিসের মাথায় এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে টাকা। বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা থাকলে এটা সম্ভব না।
সে আরো লিখেছে, "কথা হলো, এতো সাহস এরা পাইতেসে কই? আমার মনে হয়, সরকারের এবার কঠোর হওয়া উচিত।"
যারা সাহস করে শেখ হাসিনার মতো দৃঢ় মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারলো, তাদের সাহসের হিসাব নিবে এবার সার্জিস আলম! এখানে অবশ্য সে ঝাড়ি মেরে তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে। অবশ্য এরপরেও নিবৃত্ত না হলে এদেরকে কী করা হবে, সে হিন্টসও আছে তার পোস্টে,
"আনসারদের মতো নাহলে এরাও কবে বইলা নিজেদের মেরে ফেলে নিজেরাই ঐটা প্রচার করে একটা বিরাট ঝামেলা তৈরি করতে পারে।"
অর্থাৎ তার ঝাড়ি শুধুমাত্র ঝাড়ি পর্যন্তই থেমে থাকবে না। এই আহতদের অনেককে খুনও করা হবে। এবং বলা হবে, তারা আত্মহত্যা করেছে। সচেতন পাঠক যদি একান্তই গোল্ডফিশ মেমোরি না হোন, তাহলে আপনাদের এখনো মনে থাকার কথা ৫ই আগস্টের পর বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেত্রীর "আত্মহত্যা"র খবর। মেয়েগুলোকে খুন করা হয়েছিলো। এরপর প্রচার করা হয়েছে, তারা আত্মহত্যা করেছে। এখানেও একইরকম ঘটনা ঘটবে।
স্ট্যাটাসটি সারজিসরা শেষ করেছে এভাবে, "আপনারা বারবার বলতেছেন, চিকিৎসা করেন, চিকিৎসা করেন, চিকিৎসা করেন। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করা যায়। বাট সুস্থ মানুষ যখন রাস্তায় শুয়ে উপদেষ্টা হওয়ার দাবি করে, সেইটার চিকিৎসা কী হবে?"
এরা আহত কি না, পঙ্গু কি না, তা তো কমবেশি দৃশ্যমান। আরো দরকার হলে ডাক্তারই তার সার্টিফিকেট দিতে পারবে। এতোদিন এরা "জুলাই বিপ্লবে" আহত "সংখ্যা"র অন্তর্ভূক্ত ছিলো। কিন্তু আজ অধিকারের জন্য মুখ খুলতেই তারা "সুস্থ" হয়ে গেলো! পরিসংখ্যান থেকে তাদের নাম কাটা গেলো!
তবে এরা অধিকার চাওয়ায় সার্জিস-হাসনাতদের মূল সমস্যা কোথায়, তাও এখান থেকে বুঝা যায়। তাদের আতঙ্ক হলো, এরাও ক্ষমতার ভাগ চাইতে পারে, এরাও উপদেষ্টা হতে চাইতে পারে। এরা হলো আন্দোলনের "চাষাভূষা", এরাও যদি সারজিস-হাসনাত-নাহিদদের মতো "কুলীন" হয়ে উঠতে চায়, তাহলে তো ক্ষমতা আর অর্থের ভাগাভাগিতে টান পড়ে যাবে।
আগেই বলেছি, জ'ঙ্গীদের মেটিকুলাস পরিকল্পনায় ব্যবহৃত হওয়া বোকাদের প্রতি এই মুহূর্তে আমার তেমন কোনো সহমর্মিতা নেই। তবে সর্বান্তকরনে চাই, এই বোকারাও সুচিকিৎসা পাক। একটি স্বাভাবিক জীবন পাক। আজকের তরুণ আগামীর ভবিষ্যত। তারা দেশকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। দেশকে সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্যও আমাদেরকে তাদের প্রতিই আস্থা রাখতে হবে। তারা সুস্থ হোক, সুস্থ থাকুক। জ'ঙ্গীমুক্ত হোক আগামীর বাংলাদেশ।
20241154