19/02/2026
‘‘দারসুল কুুরআন’’
বিষয়:- দৃঢ়তা ( استقامة )
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ.
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ অত:পর অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না।
(সূরা আহকাফ: আয়াত ১৩)
শাব্দিক বিশ্লেষণ:-
ইস্তিকামাত (الاستقامة) এর শাব্দিক অর্থ:-
সোজা হওয়া, স্থির ও অবিচল থাকা, সঠিক পথে স্থিরতা, সঠিকতা।
ইস্তিকামাতের পারিভাষিক অর্থ :-
ইমাম রাগিব রহ. বলেন, ইস্তিকামাত হলো সরল-সঠিক পন্থা আঁকড়ে ধরে রাখা। অর্থাৎ সরলতা ও সঠিকতার সাথে অবিচলতা মিলে ইস্তিকামাত হয়।
আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট:-
আলোচ্য আয়াতটি পবিত্র কুরআনের ৪৬ নং সূরা সুরা আহকাফ এর ১৩ নং আয়াত। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে এ সূরা নবুওয়াতের ১০ম বছরের শেষের দিকে অথবা ১১ তম বছরের শুরুর দিকে নাযিল হয়েছিল। এ সুরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে।
(তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন)
হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর সূত্রে ইমাম কুরতুবী রহ. বর্ণনা করেছেন, আলোচ্য আয়াতটি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।
কারণ মুশরিকরা বলেছিল, "আল্লাহ আমাদের প্রভু, ফেরেশতাগণ তাঁর কন্যা, এবং তারা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে" কিন্তু তারা ন্যায়পরায়ণ ছিল না।
হযরত আবু বকর রা. বললেন, আমাদের রব একমাত্র আল্লাহ, তার কোন শরীক নেই, এবং হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর তিনি এই কথার উপর অবিচল ছিলেন।
আলোচ্য আয়াতে অত্যন্ত আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভঙ্গিতে সমগ্র ইসলাম ঈমান ও সৎকর্মসমুহকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
رَبُّنَا اللَّهُ
এই বাক্যে সমগ্র ঈমান
استقامة
শব্দের মধ্যে মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর অবিচল থাকা ও তদনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় আমল করা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখা:-
আলোচ্য আয়াতে ঈমান আনা ও ঈমানে অবিচল থাকার কারণে ওয়াদা করা হয়েছে যে, তাদের ভবিষ্যতে কোন দুঃখ কষ্টের ভয় নেই এবং অতীতের কষ্টের কারণেও তারা পরিতাপ করবে না।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদের সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ করেন,
أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ خَالِدِينَ فِيهَا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ [٤٦:١٤]
অর্থ :- তারাই জান্নাতের অধিবাসী, তাতে তারা চিরকাল থাকবে, তারা যে কাজ করত তার পুরস্কার স্বরূপ।
(সূরা আহকাফ: আয়াত ১৪)
ইস্তিকামাতের ব্যাপারে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
عن سفيان بن عبد الله رضي الله عنه قال: «قلت يا رسول الله! قل لي في الإسلام قولا لا أسأل عنه أحدًا غيرك؟ قال: "قل آمنت بالله، ثم استقم» [ رواه مسلم]
হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, "আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলুন, যে ব্যাপারে এরপরে আমি আর কাউকে জিজ্ঞাসা করব না" তিনি বললেন, তুমি বলো! আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, অতঃপর এর উপর অবিচল থাক।
(সহীহ মুসলিম)
উপসংহার:-
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় ইস্তিকামাতের ভিত্তি দুই জিনিসের উপর–
ক. আল্লাহর প্রতি অটুট ঈমান।
খ. প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত দ্বীনের স্থায়ী অনুসরণ।
এ দুই ভিত্তির দিকে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের যাবতীয় বিষয় ইস্তিকামাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা আল্লাহর প্রতি অটুট ঈমান বলতে আকীদা বিষয়ক সবকিছুকেই বুঝায়। এজন্য জরুরি হল, আকীদার যত শাখা রয়েছে তার প্রতিটিতে যাবতীয় বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি পরিহার করা এবং কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসুলিল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির করলে পথভ্রষ্টতা সুনিশ্চিত।
ইসলামপূর্ব যত ধর্ম ছিল তার অনুসারীরা কেউ কেউ বাড়াবাড়ি করে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে কেউবা আবার ছাড়াছাড়িতে নিমজ্জিত হয়ে ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছে ।
কালক্রমে সেসব ধর্ম তার প্রকৃত রূপ হারিয়ে ফেলেছে। তা হারানোর আসল কারণ ইস্তিকামাতের উপর না থাকা।
ইস্তিকামাত পরিহার করার কারণে এই উম্মতের মধ্যেও বিভিন্ন দল-উপদল সৃষ্টি হয়েছে। তবে আলহামদুলিল্লাহ উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আজও ইসলামের প্রতিটি আকীদায় ইস্তিকামাতের উপর রয়েছে।
কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী না আসায়, একটি দল কিয়ামত তক্ ইস্তিকামাতের উপর থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আলোচ্য আয়াত থেকে শিক্ষা:-
আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ আকীদা-বিশ্বাস হেফাজতের প্রতি যত্নবান থাকা, যাতে কোনরকম বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির শিকার হয়ে ইস্তিকামাত থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়ি এবং মৃত্যু পর্যন্ত সঠিক বিশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য সবকিছু সহজ করে দিক। আমিন
মুহাম্মাদ মাহফুজ আহমাদ
মুবাল্লিগ,
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ