18/07/2026
২০১৮ সালের শুরুরদিকে কোন একটা কাজে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। রাত তখন সাড়ে এগারোটা কি বারোটা বাজে, হঠাৎ খুব করে মন চাইল সমুদ্রের পাড়ে যেতে। সমুদ্রের শো শো শব্দ যেন আমার কানে তোলপাড় শুরু করেছে আর যেন কী এক মাতাল করা মোহিনী আবেশে আমাকে ডেকে চলেছে তার দিকে!
সমুদ্র আমার বরাবরই পছন্দের। তীরহারা দিগন্তবিস্তৃত তার জলরাশি, ঢেউয়ের উথাল-পাতাল গর্জন, আকাশের নিচে তার নিঃসীম নিরন্তর বয়ে চলা আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে রাখে। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা পাহাড় কেনার শখ ছিল, আর আমার অনেক ইচ্ছে একটা সমুদ্র কেনার। একটা সমুদ্র—একান্ত নিজের করে!
সেই মাঝরাতে আমরা কয়েকজন মিলে চলে এলাম সমুদ্রের পাড়ে। সমুদ্রের যতো কাছে আসি, তার শো শো শব্দ মাথার আরো ভিতরে ভীষণভাবে বাজতে থাকে। নিউরণে অনুরণনের মতো—যেন মহাশূন্যের কোথাও চলছে অবিশ্রান্ত মহাজাগতিক বোঝাপড়া।
সমুদ্রের নিকটে এসে আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম! এ যেন সমুদ্র নয়, এন্টাকর্টিকা মহাদেশ থেকে উড়ে এসে পড়া বিশাল এক শুভ্র বরফখন্ড—যতোদূর চোখ যায় তার বিস্তৃতি! পুরো সমুদ্র যেন ঢেকে আছে শাদা বরফের চাদরে। আমার ঘোর কাটে পাশ থেকে একজনের আওয়াজে যখন সে বলল, 'বাহ, সমুদ্রে এমন ফেনা তো আগে কোনোদিন দেখিনি!'
আচ্ছা, এই শুভ্র সফেদ বস্তু তাহলে সমুদ্রের ফেনারাশি বটে! এতো সুন্দর তার আস্তরণ, এতো চমৎকার তার জলের গায়ে লেপ্টে থাকার ধরণ! শুভ্র ফেনার অলঙ্কার গায়ে সমুদ্রের এই রূপ ছিল আমার কাছে নতুন এবং নান্দনিক।
নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা হাদিস পড়ে আমার সেদিনকার কক্সবাজারের ওই স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেল। একটা উদাহরণ দিতে গিয়ে নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমুদ্রের ফেনার কথা উল্লেখ করেছিলেন বলেই হয়তো-বা, আমার মস্তিষ্ক স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে ঠিক ওইদিনের স্মৃতিটাকে আমার মানসপটে মেলে ধরল।
বেশ পরিচিত একটা হাদিস, তবু এর শব্দচয়নে আমার জীবনের ভালো একটা স্মৃতির উপাদানের উপস্থিতি থাকায় সেটা আমাকে একটু থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করল। আমি চোখ বন্ধ করে ভাবতে চাইলাম সেদিনের সেই মাঝ রাতের দৃশ্যটা—অথৈ জলের একটা সমুদ্র, চারদিকে তার ভাঙা-গড়ার তর্জন-গর্জন, বাতাসের বুক ফেড়ে আসা শো শো শব্দ আর দৃষ্টির সীমানা অবধি শুভ্র বরফের চাদর!
যে হাদিসটা আমাকে আমার স্মৃতির শহরে হারিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে সেটা হলো—নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিটা ফরয সালাতের পরে তেত্রিশবার সুবহান-আল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ এবং তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলবে এবং এরপর এই দুয়া পাঠ করবে—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শরীকা লাহু, লাহুল মুলক্বু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর', আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালা তার গুনাহ মাফ করে দেবেন এমনকি তার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনারাশির পরিমাণও হয়—তবুও।
আমি ভাবতে লাগলাম—সমুদ্রে কী পরিমাণ ফেনা থাকতে পারে?
ভারত মহাসাগরের খুব ছোট একটা অংশকে আমরা বঙ্গোপসাগর হিশেবে জানি। সেই ছোট অংশটার খুবই ছোট একটা কোণায় দাঁড়িয়ে আমি যে বিস্তৃত ফেনারাশি দেখেছি একদিন, তা-ও যদি হিশেবের খাতায় তুলি, আমার ধারণা সেটাও আমার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাবে। যদি সেখানে গোটা ভারত মহাসাগরটাকে ধরা হয়? যদি এর সাথে যোগ করা হয় পৃথিবীর সমস্ত সাগর-মহাসাগরকে? যদি আটলান্টিক আর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে তৈরি হওয়া ফেনারাশিকে আমার হিশেবের খাতায় তুলতে হয়—কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেই পরিমাণ?
জানি এই পরিমাণটাকে কল্পনায় আনাও অসম্ভব। কিন্তু, নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন—যদি আমাদের গুনাহের পরিমাণ সেই অসম্ভবের পর্যায়েও পৌঁছায়, তবুও আমাদের রব আমাদের সেই গুনাহগুলো অবশ্যই অবশ্যই মাফ করে দেবেন যদি আমরা ক্ষমালাভের নিয়তে আমলটা করতে পারি।
যদি জান্নাতে যেতে পারি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া'তায়ালার কাছে একটা সমুদ্র চাইব। আমার সেই সমুদ্রের পাড়ে একদিন দাওয়াত করব নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। সমুদ্রের অঢেল ফেনারাশির দিকে তাকিয়ে আমি নবিজীকে বলব—ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি সমুদ্র ভালোবাসতাম। একদিন সমুদ্রের পাড়ে এসে এর ফেনারাশির বিস্তৃতি দেখে আমি যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে যাই। তারপর অন্য আরেকদিন আপনার একটা হাদিসে সমুদ্রের ফেনারাশির উল্লেখ পেয়ে আমি হারিয়ে যাই আমার পূর্বের সেই স্মৃতিতে। ওই হাদিসটা আমার মনে এতো গভীরভাবে দাগ কেটে যায় যে—আপনার শেখানো আমলটাকে আমি আমার জীবনের পাথেয় করে নিই।
আমি কোন হাদিসটার কথা বলছি তা কি নবিজীর মনে পড়বে? যদি মনে পড়ে তবু আলাপটাকে দীর্ঘায়িত করার জন্যে তিনি হয়তো জিগ্যেশ করবেন, 'কোন হাদিসটার কথা বলছো, বলো তো?'
‘ওই যে, সালাতের শেষ করে তাসবীহ, তাহলীল আর তাহমিদের পরে যে দুয়াটা করলে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন বলেছিলেন আপনি, সেটা। এমনকি—বান্দার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনারাশির পরিমাণও হয়, তবুও। জানেন ইয়া রাসুলাল্লাহ, একজীবনে এতো এতো গুনাহ করেছি যে, মাঝে মাঝে মনে হতো—আমার গুনাহের স্তুপ করলে তা উচ্চতায় আকাশ স্পর্শ করবে। কিন্তু আমার পরম করুণাময় রব আমাকে মাফ করে দিয়েছেন। এমনকি, আমার একটা সমুদ্র নিজের করে পাওয়ার শখ ছিল বলে তিনি আমাকে এই সুবিশাল সমুদ্রটা উপহারও দিয়েছেন। কী সুমহান, কী অপার দয়া আমার রবের! আলহামদুলিল্লাহ!'
নবিজী সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো মুচকি হেসে বলবেন, ‘রাব্বানা ওয়া-লাকাল হামদ! সমস্ত প্রশংসা কেবলমাত্র আমার রবের! দেখলে মাসুম, আমার রবের কোন ওয়াদা মিথ্যে ছিল না।’
সত্যিই, আমাদের রবের কোন ওয়াদা মিথ্যে নয়।